কালো বটগাছের ছায়া

কালো বটগাছের ছায়া

 

ভোলার এক নির্জন গ্রামে থাকত এক তরুণ—তার নাম মামুন। বয়স বেশি না, তেইশ কি চব্বিশ। শহরে পড়াশোনা করে, কিন্তু ছুটিতে সে গ্রামে আসে। গ্রামের নাম চরকালী। নামের মতোই গ্রামটা যেন কেমন কালো, কেমন থমথমে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর।

গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। সবাই তাকে বলত “কালো বটগাছ”। দিনের বেলায় গাছটা সাধারণ মনে হলেও রাত নামলেই যেন তার রূপ বদলে যেত। ডালগুলো এমনভাবে ঝুলে থাকত যেন শত শত হাত অন্ধকারে নড়ে উঠছে। বাতাস না থাকলেও পাতাগুলো কাঁপত।

মামুন ছোটবেলা থেকেই এই গাছের গল্প শুনে এসেছে। লোকজন বলত, বছর দশেক আগে ওই গাছের নিচে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছিল। তার লাশ আর কখনো পাওয়া যায়নি। কেউ বলত—গাছের ভেতর টেনে নিয়েছে কিছু। কেউ বলত—নদীর পাড়ে থাকা পুরোনো শ্মশানের আত্মারা ওখানে ঘোরে।

 

মামুন এসব বিশ্বাস করত না। সে যুক্তিবাদী। শহরে পড়ে, বিজ্ঞানের ছাত্র। ভূত-টুত তার কাছে হাস্যকর।

কিন্তু সেই রাতটা তার জীবন বদলে দিল।

প্রথম রাতের শব্ধ

সেদিন ছিল অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই। পুরো গ্রাম ডুবে আছে কালি মাখা অন্ধকারে। মামুন তার দাদার পুরোনো টিনের ঘরে একা ঘুমাচ্ছিল। বাইরে হালকা বাতাস বইছিল।

 

হঠাৎ—ঠক… ঠক… ঠক…

কেউ যেন দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ছে।

মামুন চোখ মেলে তাকাল। প্রথমে ভাবল, হয়তো বাতাসে কিছু লেগে শব্দ হচ্ছে। সে উঠে দরজা খুলল।

 

বাইরে কেউ নেই।

চারদিকে নিস্তব্ধতা। শুধু দূরে কুকুরের ডাক।

সে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

কিন্তু আবার—

ঠক… ঠক… ঠক…

এবার শব্দটা দরজায় নয়, জানালায়।

মামুন বিরক্ত হয়ে উঠে জানালার দিকে গেল। জানালার কাঠের পাল্লা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে মুখে লাগল। দূরে বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তার ডালগুলো যেন নড়ছে।

হঠাৎ মামুন দেখল—গাছের নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

 

একজন মানুষ। সাদা কাপড় পরা। মাথা নিচু।

 

মামুন চোখ কচলাল।

আবার তাকাল—কেউ নেই।

 

“ভ্রম,” নিজেকে বলল সে। “চোখের ভুল।”

সে জানালা বন্ধ করল। কিন্তু সেদিন আর ঘুম এল না।

 

হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি

 

পরদিন সকালে গ্রামে হইচই পড়ে গেল। পাশের বাড়ির দশ বছরের ছেলে রাব্বি নিখোঁজ। রাত থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

 

সবাই খুঁজতে বের হলো। মামুনও গেল।

 

খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে কেউ বলল, “বটগাছের দিকটা দেখা হইছে?”

 

সবাই একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কেউ যেতে চায় না।

মামুন বলল, “চলেন, দেখি। ভয় পাওয়ার কিছু নাই।”

সে কয়েকজনকে নিয়ে বটগাছের দিকে গেল।

গাছের নিচে মাটিতে অদ্ভুত দাগ। যেন কেউ মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে কিছু। দাগগুলো গিয়ে শেষ হয়েছে গাছের গোড়ায়।

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।

গাছের ওপর থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে এল।

“মা… মা… আমাকে বাঁচাও…”

শব্দটা যেন শিশুর কণ্ঠ।

রাব্বির মা চিৎকার করে উঠলেন।

মামুন বুকের ভেতর ঠকঠক শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে বলল, “কেউ হয়তো মজা করছে।”

সে গাছের গোড়ার কাছে গিয়ে হাত দিয়ে ছুঁল।

মাটি ঠান্ডা। অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

হঠাৎ তার কানে খুব কাছে থেকে ফিসফিস—

“তুই দেখছিস… তুই শুনছিস… এখন তুই যাবি…”

মামুন ঝটকা মেরে পেছনে সরে গেল। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।

সেদিনও রাব্বিকে পাওয়া গেল না।

স্বপ্ন না বাস্তব?

সেই রাত।

মামুন ঘুমাতে পারছিল না। চোখ বন্ধ করলেই বটগাছের ছবি ভেসে উঠছে।

হঠাৎ সে অনুভব করল—কেউ তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে।

চোখ খুলতেই দেখল—একজন সাদা কাপড় পরা মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথা নিচু।

মামুন চিৎকার করতে গেল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।

মানুষটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

মুখ নেই।

 

শুধু ফাঁকা কালো গর্ত। দুই চোখের জায়গায় গভীর অন্ধকার।

 

তারপর সেই অন্ধকার থেকে বের হলো ছোট ছোট হাত… যেন শিশুর হাত… মামুনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

 

মামুন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসল।

 

ঘর খালি।

 

সে ঘামে ভিজে গেছে।

 

কিন্তু তার হাতের কব্জিতে স্পষ্ট আঙুলের দাগ।

সত্যের খোঁজে

 

মামুন সিদ্ধান্ত নিল—সে সত্য জানবেই।

 

সে গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ মানুষ হাশেম কাকার কাছে গেল।

 

হাশেম কাকা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “ওই গাছের নিচে আগে কবরস্থান আছিল। অনেক পুরান। পরে নদী ভাঙনে সব সরে যায়। কিন্তু কিছু কবর নাকি ঠিকমতো সরানো হয় নাই।”

 

“তাহলে?”

 

“বছর দশেক আগে এক লোক রাতের বেলা চ্যালেঞ্জ কইরা গাছের নিচে গেছিল। সকালে তার লাশ পাইছি। চোখ দুইটা নাই। মুখে ভয় জমাট।”

 

মামুন গিলে ফেলল।

 

“আর রাব্বি?”

 

হাশেম কাকা ফিসফিস করে বললেন, “ওরা বাচ্চাদের নেয়। কারণ বাচ্চারা ভয় পায় বেশি। ভয় খায় ওরা।”

 

মামুন বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু তার হাতের দাগ? তার স্বপ্ন?

 

সে ঠিক করল—আজ রাতেই যাবে বটগাছের নিচে।

শেষ রা

রাত বারোটা।

অমাবস্যা।

 

মামুন হাতে টর্চ নিয়ে বের হলো। পুরো গ্রাম ঘুমে।

 

বটগাছের কাছে যেতেই টর্চের আলো কাঁপতে লাগল। যেন ব্যাটারি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ চারদিক থেকে শিশুর হাসি।

 

খিলখিল… খিলখিল…

 

মামুন চিৎকার করল, “কে? সামনে আয়!”

 

গাছের ডাল থেকে ঝুলে পড়ল কয়েকটা ছায়া।

 

ধীরে ধীরে মাটিতে নামল।

 

সাদা কাপড় পরা অনেকগুলো ছোট অবয়ব। মুখ নেই। শুধু কালো গর্ত।

 

একসাথে বলল, “তুই ডেকেছিস… আমরা আইছি…”

 

মামুন পেছাতে লাগল। কিন্তু পা যেন মাটিতে আটকে গেছে।

 

হঠাৎ গাছের গুঁড়ি ফেটে গেল।

 

ভেতর থেকে বের হলো বিশাল কালো এক ছায়া। মানুষের মতো, কিন্তু লম্বায় গাছের সমান। তার মুখে অসংখ্য ফাঁকা চোখ।

 

সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ভয় দে… ভয় খা…”

 

ছোট ছায়াগুলো মামুনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

 

মামুন চিৎকার করল—“আল্লাহ!”

 

চারদিক অন্ধকার।

 

সকাল

 

পরদিন সকালে গ্রামবাসী দেখল—বটগাছের নিচে মামুন পড়ে আছে।

 

চোখ খোলা।

 

কিন্তু চোখের মণি নেই।

 

মুখে জমাট ভয়।

 

তার পাশে মাটিতে লেখা—

“ভয় আমাদের খাবার।”

 

তারপর থেকে চরকালী গ্রামে কেউ রাতে বটগাছের দিকে যায় না।

 

কিন্তু মাঝে মাঝে গভীর রাতে শোনা যায়—

ঠক… ঠক… ঠক…

 

কারো দরজায় কড়া নাড়ছে।

 

আর কেউ যদি জানালা খুলে তাকায়—

 

দূরে বটগাছের নিচে দেখা যায় এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে।

 

মাথা নিচু।

 

নাম তার—

 

মামুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *