কেন ভূমিকম্প হয়? পৃথিবীর ভেতরের অজানা শক্তির রহস্য
ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে হঠাৎ কম্পন সৃষ্টি হওয়া একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এটি সাধারণত পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্তি পাওয়ার কারণে ঘটে। আমরা অনেক সময় খবরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্পের ঘটনা শুনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন ভূমিকম্প হয়? এর পেছনে আসলে কী বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে? আজকে আমরা সহজ ভাষায় সেই বিষয়টি জানব।

পৃথিবীর গঠন ও টেকটোনিক প্লেট
পৃথিবী মূলত তিনটি প্রধান স্তরে গঠিত—ভূপৃষ্ঠ (Crust), ম্যান্টল (Mantle) এবং কেন্দ্র বা কোর (Core)। ভূপৃষ্ঠ অনেকগুলো বড় ও ছোট অংশে বিভক্ত, যেগুলোকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। এই প্লেটগুলো স্থির নয়; বরং খুব ধীরে ধীরে একে অপরের সাথে সরে যায়।
যখন দুটি প্লেট একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, দূরে সরে যায় বা একে অপরের পাশ দিয়ে ঘষে চলে, তখন প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ জমতে থাকে। একসময় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্লেট হঠাৎ সরে গেলে যে শক্তি মুক্তি পায়, সেটাই ভূমিকম্পের কারণ।
ফল্ট লাইন কী?
যেখানে টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে ফাটল বা দুর্বল অঞ্চল থাকে, তাকে ফল্ট লাইন বলা হয়। এই ফল্ট লাইনের আশেপাশেই সাধারণত ভূমিকম্প বেশি হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য ফল্ট লাইন রয়েছে। এই স্থানগুলোকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বলা হয়।
উদাহরণ হিসেবে জাপান, ইন্দোনেশিয়া এবং নেপাল ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। কারণ এই দেশগুলো একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র
ভূমিকম্প শুরু হয় পৃথিবীর অভ্যন্তরের একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে। এই স্থানকে কেন্দ্র (Focus বা Hypocenter) বলা হয়। কেন্দ্রের ঠিক উপরের ভূপৃষ্ঠের অংশকে উপকেন্দ্র (Epicenter) বলা হয়। সাধারণত উপকেন্দ্রের আশেপাশে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়।
রিখটার স্কেল ও মাত্রা
ভূমিকম্পের শক্তি পরিমাপ করা হয় রিখটার স্কেলে। এই স্কেলে সাধারণত ১ থেকে ৯ বা তার বেশি পর্যন্ত মাত্রা দেখা যায়।
- ৩ বা তার কম মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত মানুষ টের পায় না।
- ৪–৫ মাত্রার ভূমিকম্প হালকা কম্পন সৃষ্টি করে।
- ৬ বা তার বেশি হলে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- ৭ বা তার বেশি হলে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।
মাত্রা যত বেশি, শক্তি তত বেশি এবং ক্ষতির সম্ভাবনাও তত বেশি।
আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের সম্পর্ক
অনেক সময় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণেও ভূমিকম্প হয়। যখন পৃথিবীর ভেতরের ম্যাগমা উপরে ওঠে, তখন আশেপাশের শিলা ও স্তরগুলোতে চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের ফলে কম্পন হতে পারে।
মানুষ কি ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে?
প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও কিছু মানবসৃষ্ট কার্যক্রমের ফলে ছোটখাটো ভূমিকম্প হতে পারে। যেমন—
- বড় বাঁধ নির্মাণ
- গভীর খনন
- তেল ও গ্যাস উত্তোলন
- পারমাণবিক পরীক্ষা
তবে এগুলো সাধারণত খুব শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করে না।
ভূমিকম্পের সময় কী করণীয়?
ভূমিকম্প হঠাৎ ঘটে, তাই প্রস্তুত থাকা জরুরি।
- কম্পন শুরু হলে দ্রুত মজবুত টেবিল বা আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন।
- জানালা ও কাচ থেকে দূরে থাকুন।
- লিফট ব্যবহার করবেন না।
- খোলা জায়গায় থাকলে বিদ্যুতের খুঁটি ও ভবন থেকে দূরে সরে যান।
বাংলাদেশ কি ভূমিকম্পপ্রবণ?
বাংলাদেশও ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে। কারণ দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশ টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয় অঞ্চলের কাছে অবস্থিত। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে।
উপসংহার
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার ফল। এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত গবেষণা করছেন যাতে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যায় এবং মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে।
পৃথিবীর ভেতরের এই অদৃশ্য শক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের গ্রহটি জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জানা এবং প্রস্তুত থাকাই আমাদের সবার দায়িত্ব।