এক মাসে ১০ বার ভূমিকম্প যে ইঙ্গিত দেয়


বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ অস্থিরতা: ফেব্রুয়ারিতে এক বিপদসংকেত

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে ভূ-গর্ভস্থ প্লেটগুলোতে অস্বাভাবিক অস্থিরতার বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১০ বার মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এই ধারাবাহিক কম্পনের ফলে সাধারণ মানুষ নাজুক অবস্থায় রয়েছে, এবং ভূ-তত্ত্ববিদরা সতর্ক সংকেত দিয়ে বলছেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চলতি মাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা, ইউএসজিএস, জানিয়েছে, শুক্রবারের এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৩। ভূমিকম্পটি ২৯ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয় এবং এর উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। খুলনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়া কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন এলাকা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩.৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা। এছাড়াও, বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতেও এক মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৫.১। এটি মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহর থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং মাওলাইক শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সংঘটিত হয়।

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দেশের মানচিত্রে ভূমিকম্পের ধারাবাহিক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় রিখটার স্কেলে মাত্র ৩ মাত্রার কম্পন দিয়ে মাসটি শুরু হয়। এর পরের দিন রাতেও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দুইবার কম্পন অনুভূত হয়। একইদিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্পও ঘটেছে। এরপর ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে যথাক্রমে ৩.৩ এবং ৪ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক এলাকা থেকে ৪.১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটে। এভাবে, ফেব্রুয়ারির মধ্যে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ কম্পনের সাক্ষী হয়েছে দেশবাসী।

ভূতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এই ঘন ঘন কম্পনগুলো বড় ধরনের দুর্যোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চলে এবং দেশের ভেতরে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা সম্প্রতি বেড়েছে। ভূত্বকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হলে তা ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে আংশিক মুক্ত হয়। তবে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে বড় শক্তি মুক্ত না হয়, তা ভবিষ্যতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এখানকার ভূমিকম্পের ঝুঁকি বরাবরই বেশি। তবে, বর্তমানে ছোট ছোট কম্পনের এই উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি বা বারবারের হার ভবিষ্যতে একটি বিশাল মাত্রার ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দেশের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে বেশি।

বর্তমানে যদিও এসব ভূকম্পনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও বারবার এই কম্পন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি দফতর এবং ঘরবাড়িতে সাধারণ মানুষ কম্পনের অনুভূতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষজ্ঞরা দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই কম্পনগুলো শুধুমাত্র সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলেও কম্পনের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি ইঙ্গিত দেয় যে দেশের ভূ-গর্ভে শক্তি জমা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কোনো বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলছেন, জনসাধারণকে সচেতন হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের প্রভাব কমাতে জরুরি প্রস্তুতি, কম্পন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার ব্যবস্থা, এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।

ফলে, ফেব্রুয়ারির এই ভূমিকম্পের ধারাবাহিক চিত্র শুধু একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং দেশের ভূ-গর্ভস্থ অস্থিরতা মোকাবিলার জন্য সময়মতো পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানও বয়ে আনে। দেশের সরকারি সংস্থা, ভূ-তত্ত্ববিদ এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *